Friday, August 16, 2013

মালয়েশিয়ায় গিয়ে বিড়ম্বনায় শ্রমিকরা।

বেড়িয়ে আসছে সরকার প্রনীত জি-টু-জি পদ্ধতিতে জনশক্তি রপ্তানির দুর্বল দিকগুলো। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জটিলতায় সরকারিভাবে মালয়েশিয়া গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ছেন শ্রমিকেরা। সম্প্রতি এ ধরণের জটিলতায় পড়ে ফেরত এসেছেন একজন শ্রমিক। দেশে করা স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কোনও সমস্যা না থাকলেও, মালয়েশিয়া যাওয়ারর পর স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে তাকে।  দেশে ফেরার পর সরকারও কোনরকম সহায়তা করছে না বলে অভিযোগ করেছেন এই শ্রমিক। বিদেশে কাজ করে সংসারে স্বচ্ছলতা আনার স্বপ্ন ছিলো মানিকগঞ্জের আবদুল কাদেরের। এ পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ পাওয়া ১৯৮ জনের মধ্যে একজন তিনি। সবাই বলেছিলো, তিনি ভাগ্যবান। কিন্তু তার এই ..সৌভাগ্যের সময়কাল মাত্র আড়াই মাস। সরকারি ভাবে মালয়েশিয়া যেতে নির্বাচিত সবাইকে করতে হয়েছে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা। কাদেরকেও তা করা হয়েছিলো। হৃদরোগ, অ্যাজমা, ডায়বেটিকস সহ ২১টি রোগের পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ  হওয়ার পরই তিনি পান মালয়েশয়ার ভিসা। অথচ কাজে যোগ দেয়ার পর ডায়বেটিকস রোগের কারণ দেখিয়ে মাত্র এক দিনের নোটিসে তাকে করা হয় দেশচ্যুত। হতাশ হয়ে দেশে ফিরে বারডেম সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন কাদের। এর একটিতেও নেই উচ্চ ডায়বেটিকসের কোন আলামত। ভুক্তভোগী আবদুল কাদেরের দাবি, চাকরি ফিরিয়ে দিতে না পারলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হোক। বেসরকারি জনশক্তি রপ্তানিকারকদেরকে শুরু থেকেই এ পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগের বাইরে রেখেছে সরকার। এমন ঘটনায় তাই সরকারের সমালোচনা করতে ছাড় দিচ্ছেন না তারা। কাদেরের এই অসহায়ত্ব সরকার প্রণীত জি-টু-জি পদ্ধতির প্রধান দূর্বলতা বলে দাবি বায়রা মহাসচিবের আলী হায়দার  চৌধুরী।

টেলিটকের থ্রিজি প্যাকেজ: শুভঙ্করের ফাঁকি।

থ্রিজি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এগোতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি টেলিটক। টেলিটকের প্যাকেজ পরিকল্পনায় শুভঙ্করের ফাঁকির কৌশলে অধিকাংশ গ্রাহককে থ্রিজি সেবা না দিয়ে এজ টু সার্ভিসের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

গ্রাহকরা একে প্রতারণা বলেই মনে করছেন। অন্যদিকে ঘন ঘন নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে দুর্ভোগে থ্রিজি গ্রাহকরা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, নেটওয়ার্ক লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন তারা। বর্তমানে বাজারে একমাত্র থ্রিজি অপারেটর হলেও প্রায় আট মাস আগে চালু করা থ্রিজি প্রযুক্তি রাজধানীর বাইরে এখনও কার্যকরভাবে সম্প্রসারণ করতে পারেনি টেলিটক।

সূত্র জানায়, টেলিটক সিমকার্ড বিক্রির হার ভালো থাকলেও সংযোগ গ্রহণের কিছুদিন পরই সিম ব্যবহার খুব কমে যাচ্ছে কিংবা দিনের বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকছে। ফলে ব্যবহারকারীর দিক থেকে গ্রাহকসংখ্যায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই।


কূটনীতিক শাহনাজ গাজীর বিবাহ বর্হির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তোলপাড়

কূটনীতিক শাহনাজ গাজীর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার নেতিবাচক চারিত্রিক কর্মকাণ্ড দেশের ইমেজকে ক্ষুণ্ন করবে বলেও মনে করছেন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র ঢাকা টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, চীনের কুংমিংয়ে বাংলাদেশ মিশনের কনসাল জেনারেল শাহনাজ গাজীকে নিয়ে আগে থেকেই কূটনীতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে। গত ২০১০ সালে নিউইয়র্কের গ্রান্ড হায়াত হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীণ ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মাহবুবুল হক শাকিলের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ ওঠার পর থেকেই তার ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তারপরও মাহবুবুল হক শাকিলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক ভালভাবে নেয়নি অনেকে।
সূত্র জানায়, শাহনাজ গাজীর ওপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তাই নাখোশ। তাদের অনেকে অভিযোগ করে বলেন, নিউইয়র্কের ঘটনার পর শাহনাজ গাজীকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। এতে বাংলাদেশ সম্পর্কে বহির্বিশ্বে নেতিবাচক ভাবমূর্তি সৃষ্টির সুযোগ দেখা দিলেন শাহনাজ গাজীকে রাখা হয়েছিল বহাল তবিয়তে। সম্প্রতি আবারও তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিলের ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের ছবি নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। এতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার সম পর্যায়ের ক্যাডার কর্মকর্তারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে এড়াতে পারছেন না।
জানা গেছে, এর আগেও বিএনপি সরকারের আমলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক পদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকায় লন্ডনে শাহনাজ গাজীর তার পদায়ন বাগিয়ে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় ওই সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. শমসের মুবিন চৌধুরীর সঙ্গে শাহনাজের ‘চমৎকার’ ছিল।
এদিকে শাহনাজ গাজীকে নিয়ে পত্র-পত্রিকায় খবর ছাপা হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তিনি। শাহনাজ দাবি করেন তার ও  শাকিলের ছবিগুলো ফটোশপের কারসাজি। তবে ইমেজ ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞদের মনে করেন, ছবিগুলো ফটোশপের মাধ্যমে করা হয়নি। এগুলো বাস্তবে তোলা ছবি।
তাছাড়া নিউইয়র্ককাণ্ডের পরও তাদেরকে একসঙ্গে বেশ কয়েকবার গুলশানের সামদাদো রেস্টুরেন্টেও দেখা গেছে। সেখানে তাদের বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি তুলেছিলেন রেস্টুরেন্টটির কর্মচারী আলবার্ড। তিনি ঢাকা টাইমসটোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, ‘ বিভিন্ন সময় আমি শাকিল স্যার ও শাহনাজ ম্যাডামের হাস্যজ্জ্বল দৃশ্যের ছবি তুলে দিয়েছি। তারা একে অন্যের খুব ঘনিষ্ঠ বলেও জানতাম।’
এদিকে শাহনাজ গাজী নিজেও এর আগে ছবিগুলো সম্পর্কে ঢাকা টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, ‘ছবিগুলো কোথায়, কখন, কী অবস্থায় তুলেছি তাতো এখন বলতে পারব না।’
তবে মাহবুবুল হক শাকিলের ঘনিষ্ট একটি সূত্র ঢাকা টাইমসটোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, শাহনাজ গাজীর সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন। একসঙ্গে বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি তুলেছেন। এগুলোর কোনটাই ফটোশপ বা অন্যকোনো ভাবে তৈরি করা নয়।
২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা শাহনাজ গাজীকে মাহবুবুল হক শাকিল ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন বলে প্রচার করা হয়। ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পরে নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফিরে আসেন তিনি। পরে প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারির পদটিও ছাড়তে হয় তাকে। তবে শাহনাজ গাজী ছিলেন বহাল তবিয়তে। ওই ঘটনার পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রের লসএঞ্জেলসে বাংলাদেশ মিশনে ডেপুটি কনসাল জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পরে এবছরের শুরুতে চীনের কুনমিংয়ে বাংলাদেশের নতুন মিশন খোলা হলে শাহনাজ গাজীকে কনসাল জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, ওই ঘটনায় শাকিলের কোনো দায় ছিল না এ ব্যাপারে আশ্বস্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি আরও উচ্চতর পদে (বিশেষ সহকারী, মিডিয়া) নিয়োগ দেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক আসুদ আহমেদ ঢাকা টাইমস টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘শাহনাজ ম্যাডাম ও শাকিল সাহেব দুজনই সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। নিঃসন্দেহে তারা অনেক বিবেকবান। তাদের নিয়ে যা শোনযাচ্ছে তা একান্তই তাদের ব্যক্তিগত। তাই এখনও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অফিশিয়ালি বিষয়টিকে বিবেচনা করা হচ্ছে না।’
এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অধিকারের ময়নাতদন্ত

সাজেদুল হক: অধিকার সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান সম্পর্কে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুরই ভাল  জানবার কথা। যেহেতু তাদের দুই জনেরই আদর্শিক পথ একসময় এক ছিল। অধিকারের কণ্ঠ আর জামায়াত-হেফাজতের কণ্ঠকে এক বলেই ঠাওর করেছেন মাননীয় মন্ত্রী। যদিও শুক্রবারের মানবজমিনের অনলাইন সংস্করণে মিজানুর রহমান নামে এক পাঠকের মন্তব্য কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি লিখেছেন, আজকে যারা আদিলুর রহমান খানের কণ্ঠে জামায়াত-হেফাজতের আওয়াজ পান কয়েকদিন পরে তাদের কণ্ঠ আর আদিলুরের কণ্ঠ এক কণ্ঠে মিলে যেতে পারে। আদতে আদিলুরের কণ্ঠ হলো মজলুমের কণ্ঠস্বর। আদতে অধিকারের কণ্ঠ কার পক্ষে সোচ্চার? বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কি ভূমিকা ছিল অধিকারের? মানবাধিকার সংগঠনটির যাত্রা শুরু অবশ্য এরও আগে ১৯৯৪ সালে। শুরু থেকেই নির্যাতন, সীমান্ত হত্যা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার  ছিল সংগঠনটি। ২০০৩ সালে অধিকারের বার্ষিক রিপোর্ট পর্যালোচনা করলেই ‘বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে’ সংস্থাটির কথিত ভূমিকা 
স্পষ্ট হবে। তখন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে অনেকে বাহবা দিচ্ছিলেন। অথচ সেই সময়ও অধিকার তীব্র এবং তীক্ষ্ন বাসায় সমালোচনা করেছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের। ২০০৩ সালে অধিকারের বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওই বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মোট ৮১ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৪, ফেব্রুয়ারিতে ৩, মার্চে ৫, এপ্রিলে ৯, মে’তে ৪, জুনে ৭, জুলাইয়ে ৬, আগস্টে ৭, সেপ্টেম্বরে ১২, অক্টোবরে ৯ এবং ডিসেম্বরে ৭ জন। ৫৪ ধারায় অনেক গরিব এবং নিরপরাধ মানুষের গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এর আগে ২০০১ সালে যে নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসে সে নির্বাচনে সংঘটিত সহিংসতার বিবরণও প্রকাশ করে অধিকার। অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ীই ওই নির্বাচনে সহিংসতায় ৫২ জন নিহত হন।
আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের ট্রাম্পকার্ডকালীন সময়েও অধিকারের ভূমিকা আমরা পরীক্ষা করবো। ২০০৪ সালের ৩০শে এপ্রিল সরকার পতনের ডেডলাইন ঘোষণা করেছিলেন আবদুল জলিল। সে সময় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন লুৎফুজ্জামান বাবর। অতিউৎসাহী আর ‘সফল’ ভূমিকা তৎকালীন সরকারে তার প্রভাবও অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। তার নির্দেশে সেসময় বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় গণগ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। অধিকারই সে সময় সাড়ে আট হাজার লোক গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ করেছিল। সরকারবিরোধী প্রচারণার অন্যতম হাতিয়ার ছিল সেই রিপোর্ট। অধিকারের ২০০৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী সে বছর র‌্যাবের ক্রসফায়ারে ৭৯ জন, পুলশের হাতে ১২৮ জন নিহত হয়। ওই বছর ৫ জন সাংবাদিক হত্যা আর ১১১ জন নির্যাতিত হওয়ার বিবরণও সে রিপোর্টে রয়েছে।
২০০১ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত মানবাধিকার নিয়ে নিয়মিতই প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে অধিকার। বিএনপির শাসনামল, ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং বর্তমান সরকারের আমলে এসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল বেগম খালেদার জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। ২০০৭-০৮ সালে ক্ষমতায় ছিল সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আর ২০০৯ সালের শুরু থেকে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ১৩ বছরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩৯৪৮ জন। আর আহত হয়েছেন ১ লাখ ৫২ হাজার ১৪৩ জন। এর মধ্যে ২০০১ সালে ৬৫৬, ২০০২ সালে ৪২০, ২০০৩ সালে ৪৩৬, ২০০৪ সালে ৫২৬, ২০০৫ সালে ৩১০, ২০০৬ সালে ৩৭৪, ২০০৭ সালে ৭৯, ২০০৮ সালে ৫০, ২০০৯ সালে ২৫১, ২০১০ সালে ২২০, ২০১১ সালে ১৩৫, ২০১২ সালে ১৬৯ এবং ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত ৩২২ জন নিহত হয়েছেন।
অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ১৩ বছরে বাংলাদেশে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন ২১৫১ জন। এর মধ্যে ২০০১ সালে ৪৪, ২০০২ সালে ৮৩, ২০০৩ সালে ৮১, ২০০৪ সালে ২৪০, ২০০৫ সালে ৩৯৬, ২০০৬ সালে ৩৫৫, ২০০৭ সালে ১৮৪, ২০০৮ সালে ১৪৯, ২০০৯ সালে ১৫৪, ২০১০ সালে ১২৭, ২০১১ সালে ৮৪, ২০১২ সালে ৭০ এবং ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত ১৮৪ জন নিহত হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে ২০০১ থেকে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ২৯৭ জন। এর মধ্যে ২০০১ সালে ৮, ২০০২ সালে ৫০, ২০০৩ সালে ২৫, ২০০৪ সালে ৪৬, ২০০৫ সালে ২৬, ২০০৬ সালে ২৭, ২০০৭ সালে ৩০, ২০০৮ সালে ১২, ২০০৯ সালে ২১, ২০১০ সালে ২২, ২০১১ সালে ১৭, ২০১২ সালে ৭ এবং ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত ৬ জন নিহত হয়েছেন।
অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ১৩ বছরে মোট ২৫ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২০০১ সালে ২, ২০০২ সালে ৩, ২০০৪ সালে ৫, ২০০৫ সালে ২, ২০০৬ সালে ১, ২০০৯ সালে ৩, ২০১০ সালে ৪, ২০১২ সালে ৫ জন নিহত হয়েছেন।
শেষ কথা: আদতে স্থান, কাল ভিন্ন হলেও মানবাধিকারের সংজ্ঞা অভিন্ন। যুদ্ধ অথবা শান্তি সবসময় একই ভাষায় কথা বলে মানবাধিকার। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষাও এক। আওয়ামী লীগ, বিএনপি আর তত্ত্বাবধায়ক সবসময়ই অধিকারের ভাষাও কি অভিন্ন নয়?

হাসিনার শত্রুর প্রয়োজন নেই।

মাহফুজ আনাম সম্পাদক, ডেইলি স্টার: এ ধরনের মন্ত্রী, উপদেষ্টা থাকার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য আসলেই কোন শত্রুর প্রয়োজন নেই। প্রধানমন্ত্রী, সরকার এবং তার দলকে বিব্রত এবং ধ্বংস করার জন্য এরাই যথেষ্ট। সমপ্রতি দু’টি ঘটনায় এটা প্রমাণ হয় যে, শেখ হাসিনা যাদের নিয়োগ দিয়েছেন অথবা যেসব কর্মকর্তা তার চারপাশে রয়েছেন তারা সরকার পরিচালনায় অক্ষম। চাতুর্যের সঙ্গে যা করা সম্ভব, তা তারা করেন দাম্ভিকতার সঙ্গে। যা যুক্তির দ্বারা করা সম্ভব   তা তারা করেন শক্তির দ্বারা। যা আইনি পথে করা সম্ভব তা তারা করেন বেআইনিভাবে। প্রথমে বলা যায়, বিলবোর্ডের ব্যাপারটি। কারণ যেভাবে এ কাজটি করা হয়েছে তাতে এর আসল উদ্দেশ্যই পণ্ড হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর পুত্র বাংলাদেশে এসে যখন ঘোষণা দিলেন যে, তিনি তার মায়ের সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের মোকাবিলা করতে সহায়তা করবেন তখন থেকেই এ প্রচারণার বিষয়টি শোনা যাচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী পুত্র যে হার্ভার্ড কনসালটেন্টের কথা বলেছিলেন তিনি হয়তো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বা অন্যান্য নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক প্রচারণার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওইসব প্রচারণায় বিলবোর্ডসহ গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে অর্থ খরচের বিষয়টিও নিশ্চিয়ই হয়তো আলোচনায় এসেছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন অনুমোদনের পরই অদক্ষ, ভাড়া আদায়ের মানসিকতা এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয়টির উদয় ঘটে আর বিলবোর্ড কেলেঙ্কারির জন্ম হয়। দৃশ্যত যা ছিল একটি শুভ চিন্তা সেটা পরিণত হয় জনসংযোগ বিপর্যয়ে। এর ভয়াবহ পরিণতি অবশ্য নির্বাচনের আগে বুঝা যাবে না।  প্রধানমন্ত্রীর অফিস এবং তার দলে কি একজন লোকও ছিলেন না যিনি বিষয়টির পদ্ধতিগত অবৈধতার বিষয় তুলে ধরতে পারতেন? এমন কেউ যদি সেখানে না থেকে থাকেন তাহলে প্রধানমন্ত্রীর একেবারেই কাছে যে বুদ্ধিমত্তা আর নৈতিক দেউলিয়াত্ব চলছে সেটা নিয়ে আসলেই তার গভীর উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। আর সেখানে যদি এমন ধরনের লোক থেকে থাকেন যারা এ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিবোধ করেছেন কিন্তু কিছু বলার সাহস পাননি। তাহলে প্রধানমন্ত্রীকে আরেক ধরনের সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। সেটি হলো কিভাবে তিনি দ্বিমত পোষণকারীদের বক্তব্য শোনার ব্যবস্থা করবেন। নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করার ব্যর্থতা এবং দ্বিমত প্রকাশে ভয় পাওয়া- এ দু’পক্ষই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার পথে হুমকি হিসেবে কাজ করে। প্রকৃত সত্য হচ্ছে- প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সম্পর্কে যে সমালোচনাটি সবচেয়ে বেশি হয় সেটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হয় তোষামোদকারীতে পরিপূর্ণ অথবা সেখানে পেশাদার লোকজন থাকলেও তারা কেবল হুকুম তামিল করেন। এদের অনেকেই ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রভাবকে কাজে লাগান।
অধিকারের রিপোর্ট সামলানো এবং এর সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খানের গ্রেপ্তারের বিষয়টি অদক্ষতার একটি উদাহরণ। এর সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে, তা সরকার এবং বাংলাদেশকে সারা দুনিয়ার কাছে বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি করেছে। জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ একটি বিষয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এবং বাংলাদেশ যার প্রাপ্য নয় তা পাচ্ছে। এটা আমাদের উপর আনা শেখ হাসিনা সরকারের উচিত হয়নি। ডেইলি স্টার ৫ই মে হেফাজতের সমাবেশ এবং রাতের ঘটনা কাভার করেছে। ওই ঘটনায় মৃত্যুর ব্যাপারে রিপোর্টের ক্ষেত্রে আমরা সতর্ক ছিলাম। ওই সময় এবং এখন পর্যন্ত অধিকার বর্ণিত নিহতের ৬১ সংখ্যার ব্যাপারে আমরা একমত নই। আমরা মনে করি, সরকারের অধিকার রয়েছে ‘অধিকার’ বর্ণিত সংখ্যার নিহতদের নাম এবং ঠিকানা জানার। তথ্য মন্ত্রণালয় ১০ই জুলাই তা জানতে চেয়ে অধিকারকে চিঠি দিয়েছিল। এক সপ্তাহ পর অধিকার যখন সরকারকে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল এ নিয়ে আদালতে যাওয়া। আমাদের মতে, এটি একটি ভাল মামলা হতো এবং খুব সম্ভবত আদালত অধিকারকে তথ্য দেয়ার নির্দেশ দিতো।
অদক্ষতা এবং দাম্ভিকতা আবার ফিরে আসে যখন এক মাস অপেক্ষা করার পর গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা রাত সাড়ে ৯টায় স্ত্রী এবং সন্তানসহ বাড়ি ফেরার পথে আদিলুর রহমান খানকে গ্রেপ্তার করে। সরকারের সামনে এ নিয়ে যেসব বিকল্প ছিল তার মধ্যে রয়েছে- ১. প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার জন্য দিনের বেলায় তাকে আনা যেতো ২. তাকে নোটিস দেয়া যেত যে, আইন রয়েছে এনজিও সরকারকে তথ্য দিতে বাধ্য ৩. প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য আদালতের নির্দেশনা চাওয়া যেতো ৪. মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করা যেতো ৫. সরকার বিশ্বস্ত কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করতে পারতো যে সংস্থা অধিকারের বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করতে পারতো এবং সরকারের দাবিমতো তাদের প্রতিবেদনে ভুল তথ্য থাকলে তা প্রকাশ করতে পারতো। আদিলুরকে শুধু গ্রেপ্তারই করা হয়নি, এমনকি তাকে রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে। সৌভাগ্যবশত হাইকোর্ট তা বাতিল করেছে। আমরা সবাই জানি রিমান্ডে কি হয়?
শুক্রবারের ডেইলি স্টার থেকে অনূদিত

‘আর কেউ হরতাল করলে, তাদের বাড়িতে ঢুকে হত্যা করতে হবে ’- আবদুল লতিফ সিদ্দিকী।

স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপি-জামায়াতের হরতালে দলীয় নেতাকর্মীদের তৎপরতা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে সরকারের এ মন্ত্রী বলেন, ‘আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াত হরতাল করে। আর রাস্তায় শুধু পুলিশ থাকে। আমাদের নেতাকর্মীরা নেতার হুকুমের অপেক্ষায় বসে থাকে। আমি বলছি, এটিই আমার শেষ বক্তৃতা। আর কেউ হরতাল করলে তাদের বাড়িতে ঢুকে হত্যা করতে হবে।’ তারা হত্যার রাজনীতি করবে আর আমরা বসে বসে আঙুল চুষবো?
গতকাল বিকালে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হরতাল আহ্বানকারীদের অপশক্তি উল্লেখ করে লতিফ সিদ্দিকী দলীয় সভানেত্রীর উদ্দেশে বলেন, এসব অপশক্তিকে শক্ত হাতে দমন করতে না পারলে আমি বিদ্রোহ করবো। তিনি নিজের গায়ে লাল পাঞ্জাবি ও সাদা কোট দেখিয়ে বলেন, এই সাদা হলো শান্তির প্রতীক আর লাল হলো বিদ্রোহের প্রতীক। আমাদের দুটিই জানা আছে।
লতিফ সিদ্দিকী উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, নেতার হুকুম দিতে হবে। আপনারা তাহলে কি করেন। আজ থেকে শপথ নিন। শোক দিবসে শক্তির শপথ নিন।
সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচন হবে উল্লেখ করে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী বলেন, পাগল-ছাগল আর স্বাধীনতাবিরোধীদের দোসর, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি কি বলবে- তা আমাদের শুনতে হবে না। ১৫ই আগস্ট বিরোধীদলীয় নেতার জন্মদিন পালনের সমালোচনা করে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিকে উৎসাহিত করতেই এরা জন্মদিন পালন করে। দলীয় সভানেত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, অপশক্তিকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। মানবতা ব্যবসায়ী ও ধর্মের ব্যবসায়ীদের দিকে তাকানো উচিত হবে না।

Tuesday, August 13, 2013

লেজে গোবরে বিলবোর্ড চমক।

ইনকিলাব রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রীর বেশ কাছের মানুষ, সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য বেশ হতাশা নিয়েই বললেন, গত প্রায় পাঁচটি বছর সরকার কে চালালো আমরা নিজেরাই বুঝলাম না। নেত্রী একাই তো সব করলেন। রাষ্ট্র, সরকার ও দলের জুতা সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সবই কেন তাকেই করতে হলো? সিনিয়র নেতা, মন্ত্রিসভা, দায়িত্বশীল এমপি, আমলা কেউই যেন কিছু পূর্ণরূপে করার ক্ষমতা বা দক্ষতা রাখেন না। কেবল প্রধানমন্ত্রীর অফিসই সবকিছুর নিয়ন্তা আর সব সিদ্ধান্ত এককভাবে প্রধানমন্ত্রীকেই নিতে হয়েছে। সাফল্য ও ব্যর্থতা সবই তার। কিন্তু একটি সংগঠন বা সরকারে তো আরো লোকজন আছে। সুখ দুঃখের ভাগ তো তাদেরও নেয়া চাই। সাফল্য ও ব্যর্থতার দায়ভাগ তো তাদের ঘাড়েও চাপবে। রাজধানী জুড়ে রাতারাতি বিলবোর্ড চমক। মাত্র দশ দিনের মাথায় এসব প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে খুলে ফেলা হচ্ছে। এত সমালোচনা ও নিন্দার মুখোমুখি কেন হলাম আমরা? কে বা কারা বিলবোর্ড লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার বলে তারা জানেনা, পার্টির লোকেরা বলে আমরাও জানিনা। তা হলে কে জানে? এসব কি ভূতে লাগিয়েছে? বিলবোর্ড ভাড়া নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষ কিংবা দলীয় দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে নির্ভুল তথ্য, রুচিশীল ডিজাইন, ছবি ও কালার নিশ্চিত করে এই প্রচারণার ব্যবস্থা নিলে, এত সমালোচনার মুখেও আমাদের পড়তে হতো না। কোটি কোটি টাকা খরচ করে টানানো বিলবোর্ড সাতদিনের মাথায় নামাতেও হতো না। যদি সাতদিনের জন্যও এসব ভাড়া নেয়া হয়ে থাকে তাহলে রমজানের শেষ সাতদিনের জন্য কেন নেয়া হলো না। যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকায় আসা-যাওয়া ও চলাচল করেছে। ঈদের ছুটিতে যখন রাজধানীতে লোকজনই ছিল না তখন জনমানবহীন ঢাকায় কেন উন্নয়নের ফিরিস্তি টানিয়ে রাখা হলো? দেশে-বিদেশে সমালোচনা ও দেশবাসীর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জশ দিয়ে সংশ্লিষ্টরা নীরব। শেষপর্যন্ত এ বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীকেই দেখতে হলো।
গত ৪ আগস্ট রাতে রাজধানীর শত শত বিলবোর্ডে বাণিজ্যিকভাবে টানানো বিজ্ঞাপন চিত্রগুলোর উপর ডিজিটাল স্ক্রিন সেঁটে দেয়া হয়। আলাদিনের চেরাগের দৈত্য এ কাজ করেছে বলে অনেকে মন্তব্য করেন। বিএনপির সিনিয়র নেতা এমকে আনোয়ার বলেছেন, ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব বিলবোর্ডের জন্য সরকারকে জবাব দিতে হবে। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, সরকার সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়েছে, অনেক অর্ধসত্য তথ্য প্রচার করেও মানুষকে ধোঁকা দিতে চেয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, বিএনপি পারলে সরকারের ব্যর্থতাগুলোও বিলবোর্ডে প্রচার করুক। তারা সরকারের সাফল্য দেখতে পায় না বলে তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার জন্যই এই বিলবোর্ড। দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, শুধু রাজধানীতে নয়, গ্রামে গঞ্জেও ডিজিটাল বিলবোর্ড লাগানো হবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, তিনি ঢাকায় বিলবোর্ড লাগানোর ব্যাপারে কিছুই জানেন না। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, এসব সরকার লাগায়নি। সরকার লাগালে বিলবোর্ডে কর্তৃপক্ষ, দফতর বা বিভাগের উল্লেখ থাকত। ডিসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে তাদের অজ্ঞতা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। এদিকে প্রথম আলোর ৪টি, ইউনিলিভারের ২০০ ছাড়াও রাজধানীতে ডিসিসি অনুমোদিত ৪ হাজার বিলবোর্ডের অনেকাংশই আকস্মিকভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিলবোর্ড ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ বলেন, রাজধানীতে বিলবোর্ড ব্যবসায় তাদের মাধ্যমে অন্তত ২ হাজার ৪শ’ কোটি টাকার লেনদেন হয়। একমাস যদি সরকার এসব বিলবোর্ড দখল করে রাখে তাহলে ২০ কোটি টাকা গচ্ছা যাবে তাদের। সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী কোনরূপ যোগাযোগ, ভাড়া বা চুক্তি ছাড়াই অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের বিলবোর্ড দখল করে নেয়ার ফলে বিলবোর্ড ব্যবসায়ী ১২০টি প্রতিষ্ঠানের অনেকেই শ্রমিক-কর্মচারীদের ঈদের বেতন বোনাস দিতে পারেনি। অনেক কোম্পানি তাদের সাথে কৃত চুক্তিও বাতিল করে দিতে চাইছে। সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ, এমনকি সরকারের অংশীদার বহু লোকও এ ব্যবসায় জড়িত। বিলবোর্ড চমকের আগপাছ চিন্তা না করে, কোনরূপ পরামর্শ না করে, যে কোন কর্ণার থেকে এমন একটি অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত যে সরকারের জন্য এতটা মারাত্মক ক্ষতিকর সাব্যস্ত হবে, তা সংশ্লিষ্টরা ভাবতেও পারেননি। বর্তমানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেই এ বিষয়ে মুখ খুলতে এবং সমাধান দিতে হচ্ছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রফেসর বি. চৌধুরী বলেছেন, বিলবোর্ড দখল করে অর্ধসত্য ও কৌশলী প্রচারের জন্য সরকারের ক্ষমা চাওয়া উচিত। অপর সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, বিলবোর্ড প্রচারণা সরকারের জন্য বুমেরাং হবে।  নেজামে ইসলাম নেতা মুফতী ইজহারুল ইসলাম বলেন, এ সরকারের অধীনে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও অবাধ হবে তার নমুনা বিলবোর্ড দখল থেকেই বোঝা যায়। যারা নীতি-নৈতিকতার ধার না ধরে গায়ের জোরে বিলবোর্ড দখল নিয়ে সত্য-অর্ধসত্য প্রচারণা চালায়। আবার সরকার, পার্টি বা কর্তৃপক্ষ কেউই এই অপকর্মের দায় নেয়ার সাহস পায় না। এমন দলের হাতে দেশ, জনগণ, গণতন্ত্র ও রাজনীতি কতটুকু নিরাপদ এটাই প্রশ্ন।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেকমন্ত্রী বলেন, ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ এখন ভুল পথে চলছে। অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্য দেয়া হচ্ছে না। নেত্রী নিজেও তার বিবেচনা সঠিকভাবে কাজে লাগাচ্ছেন বলে মনে হয় না। আমার কেন জানি মনে হয়, হাইব্রিড নেতা, বামপন্থ’ী নব্য আওয়ামী লীগার ও কচিকাঁচার পরামর্শেই তিনি ইদানীং অনেকগুলো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ধারণা করি বিলবোর্ডের সিদ্ধান্তও কোন কচিকাঁচার। রংপুরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পুত্র জয়ই তাকে ডিজিটাল পদ্ধতি শিখিয়েছে, সম্ভবত জয়ের পরামর্শেই এই বিলবোর্ড চমক। দল, সংগঠন, সরকার ও প্রধানমন্ত্রীকে এত বড় একটা অন্যায় এবং বেঠিক সিদ্ধান্তের দিকে যদি কচিকাঁচারা ঠেলে দিয়ে থাকে তাহলে আওয়ামী লীগের কপালে দুঃখ আছে। কতটুকু কোণঠাসা হলে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হয়, আমরা সাতদিনের জন্য এসব বিলবোর্ড ভাড়া নিয়েছিলাম। এখন এসব অপসারণ করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে বিলবোর্ডে প্রচারিত ভুল, অর্ধসত্য, অতিরঞ্জিত ও শুভংকরের ফাঁকিমূলক তথ্যের বিষয়ে ও ব্যাখ্যায় প্রতিবাদ বা পাল্টা বক্তব্য আসতে শুরু করেছে। অনেক সাফল্য এমনও দেখানো হয়েছে যা এ সরকারের আমলের নয়। কিছু প্রকল্প শুরু হতেও অন্তত ৫ বছর বাকি, সেসবও সাফল্যরূপে প্রচারিত হয়েছে। কিছু প্রকল্প মাত্র ফিতা কেটে উদ্বোধন করা হবে, এগুলোও সাফল্য। ৫০ ভাগ কাজও দীর্ঘ ৫ বছরে সমাপ্ত হয়নি, এমন প্রকল্পকেও বিলবোর্ডে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বহু প্রকল্প এমন আছে যেসব কাগজেপত্রে বাস্তবায়িত হলেও সংশ্লিষ্টরা এর সুফল এখনো হাতে পাননি। কিছু প্রকল্পে হিসাবের গড় পড়তা অংক দেখিয়ে শুভংকরের ফাঁকি দেয়া হয়েছে। যেগুলো নিয়ে ক্রমেই মিডিয়া সরগরম হয়ে উঠছিল। অপরিপক্ব চিন্তার বিলবোর্ড চমক যে সত্যিই বুমেরাং হয়ে যাবে কিংবা সস্তা প্রচারের এ নীতিবিবর্জিত উদ্যোগের যে এমন লেজে গোবরে অবস্থা হবে তা কিন্তু সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তরা আগে বুঝেননি। এমন বেসামাল কাজ করা হবে, দল মহাজোট বা সরকারের শরিকরা তা স্বপ্নেও ভাবেনি। এ নিয়ে দলের হিতাকাক্সক্ষী নেতাকর্মীরা বেশ বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন।